সাংবাদিকতার আড়ালে ‘ডিজিটাল মাফিয়া’: ভুয়া পোর্টালে কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল
প্রথমে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট ও
মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এরপর সেই সংবাদের লিংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার
হোয়াটসঅ্যাপ বা মোবাইলে পাঠিয়ে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। টাকা না দিলে
সংবাদটি ফেসবুকে ‘বুস্ট’ করে সামাজিকভাবে হেনস্তা করার হুমকি দেওয়া হয়।
সাংবাদিকতার আড়ালে ‘ডিজিটাল মাফিয়া’র মতো গড়ে ওঠা এমন একটি চক্রের
সন্ধান পাওয়া গেছে ‘প্রতিদিনের আলো’ (pratidineralo.com) নামের একটি ভুয়া অনলাইন
পোর্টালকে কেন্দ্র করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি)
একজন পরিচালক এই চক্রের নিশানায় পরিণত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘বিগত সরকারের দোসর’
বা ‘দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ গড়া’র মতো কাল্পনিক অভিযোগ তুলে নিউজ করা
হয়। এরপর ওই পোর্টালের কথিত সম্পাদক এস এ শাওন (০১৪০৪-৬৫০৪১১) ওই কর্মকর্তার
কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। শর্ত দেওয়া হয়, টাকা দিলে লিংক মুছে ফেলা
হবে, না দিলে এটি ভাইরাল করা হবে।
অস্তিত্বহীন অফিস, ভুয়া সম্পাদক
পোর্টালে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী রাজধানীর নয়াপল্টন হাউজিংয়ের ১০/কে নম্বর বাড়িতে
গিয়ে ‘প্রতিদিনের আলো’র কোনো দপ্তরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা
জানান, এই নামে কোনো সংবাদমাধ্যমের অফিস সেখানে নেই। মূলত একটি ভুয়া
ঠিকানা ব্যবহার করে এবং নিজের নামের শেষে ‘এলএলবি’ পদবি জুড়ে দিয়ে এস এ
শাওন নামের ওই ব্যক্তি দেশজুড়ে এই চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক চালাচ্ছেন। পোর্টালটিতে
দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি সংবাদই বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও
রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দিয়ে সাজানো।
রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ যখন অস্ত্র
বর্তমান প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে এই চক্রটি কর্মকর্তাদের নামের সাথে ‘আওয়ামী লীগ’
বা ‘সিন্ডিকেট প্রধান’ তকমা ব্যবহার করছে। এর উদ্দেশ্য হলো—কর্মকর্তাদের মধ্যে
ভীতি তৈরি করা যাতে তারা সম্মান বাঁচাতে দ্রুত টাকা দিতে রাজি হন। নাম প্রকাশ
না করার শর্তে সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “এরা মূলত ‘ডিজিটাল এক্সটর্শনিস্ট’।
এদের নিউজের কোনো সোর্স থাকে না, থাকে শুধু ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্য।”
যা বলছেন সাংবাদিক নেতা ও বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একজন শীর্ষ নেতা বলেন, “এরা
সাংবাদিক নয়, সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ব্যবহারকারী অপরাধী। যারা
সংবাদের লিংক পাঠিয়ে ডিলিট করার বিনিময়ে টাকা চায়, তারা পেশাদার
সংবাদকর্মী হতে পারে না। এসব আন্ডারগ্রাউন্ড পোর্টাল ও এদের
তথাকথিত সম্পাদকদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. তানভীর হাসান জোহা বলেন, “এটি ডিজিটাল চাঁদাবাজির
একটি নতুন ধরন। এরা ফেসবুক বুস্টিংকে হুমকির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এই ডোমেইনটি ব্লক করা এবং মোবাইল নম্বরের
কললিস্ট ধরে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা।”
দুদকের কড়া বার্তা
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, “কারও
বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা দুদক তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে।
কোনো অনলাইন পোর্টাল যদি দুদকের নাম ভাঙিয়ে বা বানোয়াট দুর্নীতির তথ্য দিয়ে
অর্থ দাবি করে, তবে সেটি ফৌজদারি অপরাধ। কর্মকর্তাদের উচিত এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত
না হয়ে সরাসরি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানানো।”
আইনি পদক্ষেপ
আইনজীবীদের মতে, সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ অনুযায়ী, অনলাইনে মানহানিকর তথ্য প্রচার
এবং ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করা অ-জামিনযোগ্য অপরাধ। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী মহলের পক্ষ
থেকে এই চক্রের বিরুদ্ধে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটে তথ্য ও প্রমাণসহ
অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাংবাদিকতার পবিত্রতা রক্ষা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের
কর্মপরিবেশ নিরাপদ রাখতে ‘প্রতিদিনের আলো’র মতো ভুয়া পোর্টালগুলো
দ্রুত বন্ধ করা জরুরি।

-2021-08-29-21-21-25.gif)
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: