আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

প্রভাষ আমীন | প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২১ ০৮:১১

 প্রভাষ আমীন

গল্পটা আগেও বলেছি। আসলে গল্প নয়, সত্যি ঘটনা। বেশ কয়েক বছর আগে আমার মামা বাড়ির এলাকার এক ভদ্রলোক এলেন আমার অফিসে। তিনিও সম্পর্কে আমার মামা। অনেক বছর পর মামাবাড়ির এলাকার কাউকে পেয়ে আমি নস্টালজিক হয়ে গেলাম। অনেক স্মৃতিচারণা হলো। পরে বললেন, তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। এখন দেশে ফিরেছেন। দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে চান। পরে খোলাসা করলেন, তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। আমি ভাবলাম, কাভারেজ-টাভারেজ চাইবেন। মনে মনে ভেবেও নিলাম, প্রয়োজনে একদিন তার মিছিলের ছবি দেখিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু তিনি আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও সহায়তা লাগবে না। তিনি মনোনয়ন সংক্রান্ত সহায়তা চান। আমার দৃষ্টিতে বিস্ময় দেখে তিনি ব্যাখ্যা করলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেই জয় নিশ্চিত। তাই মূল লড়াইটা হয় মনোনয়নের টেবিলে, নির্বাচনের ময়দানে যা হয় সব সাজানো। এবার তিনি আরও খোলাসা করলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে টাকা লাগে। টাকা দিতে তার আপত্তি নেই। প্রয়োজনে বেশিই দেবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই কৌশলে অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরাও টাকা নিয়ে ঢাকা এসেছেন। আমার কাছে তার চাওয়া হলো, টাকা দিলে মনোনয়ন যাতে নিশ্চিত হয়, সেটা যেন আমি বলে দেই। কারণ, টাকা দিয়ে মনোনয়ন না পেলে পরে আর সেই টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। আমি মনে মনে বিরক্ত হলেও সেটা গোপন করে বললাম, মামা টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কেনা যায়, এমন খবর আমার জানা নেই। আর আমি বলে দিলে তিনি মনোনয়ন পাবেন, এমন কোনও যোগাযোগও আমার নেই। তিনি মনঃক্ষুণ্ন হয়ে ফিরে গেলেন।

পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, ঘটনা মিথ্যা নয়। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে টাকা লাগে। শুধু মনোনয়ন নয়, আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পদ-পদবি পেতেও টাকা লাগে। পুরো বিষয়টাই এখন ওপেন সিক্রেট। দেশজুড়ে এখন দফায় দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে। এসব নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়েও নানান কথা বাতাসে। স্থানীয় পর্যায় থেকে নামের তালিকা পাঠানো হয় কেন্দ্রে। কেন্দ্র সেই তালিকা থেকে মনোনয়ন চূড়ান্ত করে। তবে সেই তালিকার বাইরের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ক’দিন আগে স্থানীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর নাম পাঠান। টাকা খেয়ে খারাপ লোকের নাম কেন্দ্রে পাঠাবেন না।’ তার মানে বিষয়টা পরিষ্কার, ‘টাকা খেয়ে’ নাম পাঠানোর ঘটনা ঘটে। আর ঘটনা যে ঘটে সেটা পত্রপত্রিকায় চোখ রাখলেই বোঝা যায়। চলুন কয়েকটি পত্রিকার শিরোনামে চোখ বুলিয়ে আসি, ‘সিলেটে এককালের শিবির নেতা এখন নৌকার প্রার্থী’, ‘ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পেলেন নৌকা প্রতীক’, ‘আওয়ামী লীগের তালিকায় বিএনপির সাবেক নেতা’, ‘তৃণমূল নাম না দিলেও মনোনয়ন পেলেন প্রবাসী’।

চাইলে এ তালিকা আরও অনেক লম্বা করা যাবে। আমি একটা জিনিস বুঝলাম না, টাকা খেয়ে বিএনপি বা শিবির নেতাকে মনোনয়ন দিতে হবে কেন? আওয়ামী লীগে কি টাকা দেওয়ার মতো নেতার অভাব রয়েছে। নাকি শিবির, ছাত্রদলের রেট বেশি? আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কি নিলামে বিক্রি হয়?

অবস্থাটা মনে হয় এমনই, যিনি বেশি টাকা দেবেন, যে দলই করুন তিনিই মনোনয়ন পাবেন। একযুগ ক্ষমতায় আছে বলেই নয়, বরাবরই আওয়ামী লীগের মূল শক্তি তার তৃণমূল। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাংগঠনিক ভিত্তিই বিভিন্ন বিপর্যয়ে দলকে টিকিয়ে রেখেছে। একযুগ ক্ষমতায় থাকার সুযোগে তৃণমূলকে আরও শক্তিশালী করতে পারতো আওয়ামী লীগ। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টো। আওয়ামী লীগের তৃণমূলে এখন হাইব্রিডের ভিড়। নানান সুযোগ-সুবিধা পেতে, মামলা থেকে বাঁচতে বিএনপি, জামায়াত, শিবিরের নেতারা এখন ভিড়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগে। দ্রুত তারা চলে আসছে সামনেও। আওয়ামী লীগের দরজা খোলা, কেউ ফেরে না খালি হাতে। সবাই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চাইবে, ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিতে চাইবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে, তারা কাকে নেবে, কাকে নেবে না বা আদৌ বাইরের কাউকে নিতে হবে কিনা। আগেই যেমন বলেছি, দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের শক্ত ভিত্তি আছে। ৭৫’র পর ২১ বছর এরা লড়াই-সংগ্রাম করে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রেখেছে। বিভিন্ন সময়ে এরা নির্যাতিত হয়েছে। দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতেই তো আওয়ামী লীগের দম ফেলার সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। অন্য দলের নেতাদের আওয়ামী লীগে নিতে হবে কেন? আওয়ামী লীগে কি আওয়ামী লীগ নেতার ঘাটতি পড়েছে? বছরের পর বছর যারা দলের জন্য ত্যাগ করেছেন, দল এখন তাদের ত্যাগ করছে। ক্রিম খেয়ে নিচ্ছে উড়ে এসে জুড়ে বসা সুখের পায়রারা। আওয়ামী লীগের মাঠে এখন ফসলের চেয়ে আগাছা বেশি।

জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর সিলেটে এখন উত্তেজনা। টাকার বিনিময়ে কমিটি ঘোষণার অভিযোগ এনে ছাত্রলীগেরই একাংশ বিক্ষোভ করছে। নতুন কমিটির নেতাদের বাসায় ভাঙচুর করেছে ছাত্রলীগের বঞ্চিতরা। যেকোনও সংগঠনের কমিটি ঘোষণার পরই কিছু নেতা নিজেদের বঞ্চিত মনে করেন। কিন্তু সিলেটের বিক্ষোভটি তেমন সরল নয়। এখানে টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে।

আওয়ামী লীগে বহিরাগতদের ‘হাইব্রিড’ বা ‘কাউয়া’ বলা হয়। এই টার্ম দুটিকে জনপ্রিয় করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ‘হাইব্রিড’ আর ‘কাউয়া’দের ব্যাপারে দলে সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠ ওবায়দুল কাদের। এই ক’দিন আগেও তিনি বলেছেন, ‘দুঃসময়ে বসন্তের কোকিলরা দলে থাকবে না, ত্যাগীরাই সুখে-দুঃখে দলের পাশে থাকবে।’ ওবায়দুল কাদের বছরের পর বছর ‘হাইব্রিড নেতা’দের বিরুদ্ধে বলছেন বটে। কিন্তু তাতে আওয়ামী লীগে তাদের অনুপ্রবেশের স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না। ঠেকায় পড়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরদের মতো দুয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সাধারণভাবে হাইব্রিডদের চিহ্নিত করে তাড়ানো বা দলে হাইব্রিডদের পৃষ্ঠপোষক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। হেলেনা জাহাঙ্গীর বা সাহেদের মতো লোকেরা কীভাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটিতে ঠাঁই পেলো, এই প্রশ্নের জবাব নেই। অথচ ওবায়দুল কাদের চাইলে মুহূর্তে হাইব্রিড এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে পারেন। ওবায়দুল কাদের যে দুঃসময়ের কথা বলেছেন, তা আসার আগেই বসন্তের কোকিলদের তাড়াতে হবে, দল পরিষ্কার করতে হবে, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতে হবে। নইলে দুঃসময় প্রলম্বিত হতে পারে।

একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা দিয়ে লেখাটি শেষ করি। রাজবাড়ি-১ আসনের এমপি কাজী কেরামত আলী রাজবাড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তার দলীয় পদটি ছোট ভাই কাজী ইরাদত আলীকে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখে দিয়েছেন। ছোট ভাই ২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন চাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। ইরাদত আলী ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ছোট ভাই যাতে মনোনয়নে বাগড়া দিতে না পারেন, সে জন্য কাজী কেরামত আলী সাধারণ সম্পাদক পদটি তাকে লিখে দেন। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টটি আমি একাধিকবার পড়েছি, বিশ্বাস হতে চায়নি। কিন্তু ঘটনা সত্য। আওয়ামী লীগ কি কারও পৈতৃক সম্পত্তি যে চাইলেই স্ট্যাম্পে সেটা লিখে দেওয়া যায়? শুধু আওয়ামী লীগ কেন, বিশ্বের কোনও সংগঠনেই স্ট্যাম্পে লিখে ছোট ভাইকে পদ দেওয়ার কোনও নজির নেই। সে ক্ষেত্রে এটি আওয়ামী লীগের ‘দেউলিয়া’পনার বিশ্বরেকর্ড হয়ে থাকবে। এভাবে চললে, ওবায়দুল কাদের যে দুঃসময়ের আশঙ্কা করছেন, তা এলে আরও প্রলম্বিত হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top