আসামির আবদার পূরণ করল দুদক!

আসামির আবদার পূরণ করল দুদক!

দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত আসামির বেআইনি আবদার পূরণ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেই আসামি হলেন পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র মো. হাবিবুর রহমান মালেক।

তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) পরিবর্তন করা হয়। অথচ তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি চেয়ে কমিশনের কাছে প্রতিবেদন পেশ করেছিলেন আগের তদন্ত কর্মকর্তা। তার পরই কমিশন সভায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এখন নতুন কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করিয়ে আসামিদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

অথচ আইনে আসামির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের কোনো ক্ষমতা দুদককে দেওয়া হয়নি। খোদ দুদকের আইনজীবী এবং আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসামির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক কোনো মামলার তদন্ত আইও পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আইনের কোথাও এমন সুযোগ রাখা হয়নি। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।

তারা বলছেন, মামলা হওয়ার পর এ ধরনের এখতিয়ার থাকে শুধু আদালতের। কিন্তু তার পরও আইনের তোয়াক্কা না করে দুদক আসামির আবেদনের ভিত্তিতে মামলার আইও পরিবর্তন করেছে। দুদকের এ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অনেকেই বলছেন, দুদক কি আসামিদের স্বার্থ রক্ষার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে?

জানা গেছে, গত বছরের ২৬ জুলাই দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে একটি কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মো. মোজাম্মেল হক খান এবং কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) সাঈদ মাহবুব খান পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান মালেকসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে করা একটি মামলার আইও পরিবর্তনের বিষয়টি উত্থাপন করেন।

তিনি জানান, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হাবিবুর রহমান মালেক গত ৩১ মে আইও পরিবর্তনের আবেদন করেছেন। আবেদনে উল্লেখ রয়েছে, মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিচালক মো. আলী আকবর একই সঙ্গে মামলাটির অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা, যাচাইকারী কর্মকর্তা এবং মামলা রুজুকারী কর্মকর্তা।

সভায় আরও জানানো হয়, এর আগে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের আবেদনের বিষয়ে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য বিধি ও আইন অনুযায়ী গ্রহণের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা প্রদানের জন্য কমিশন কর্তৃক সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে আসামি হাবিবুর রহমান ফের এ মামলার আইও পরিবর্তনের আবেদন করেছেন। সভায় বিস্তারিত আলোচনা শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিষয়ে কমিশন একমত পোষণ করে।

সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান মালেকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে দুদকের করা দুটি মামলার তদন্ত চূড়ান্ত করেছিলেন উপপরিচালক (ডিডি) আলী আকবর। তিনি অভিযোগের সত্যতা পেয়ে মামলা দুটিতে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি চেয়েছিলেন। আর ওই পর্যায়ে তাকে সরিয়ে নতুন আইও হিসেবে ডিডি নুরুল হুদাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর নতুন আইও নুরুল হুদা তদন্ত করে মামলা দুটিতে ফাইনাল রিপোর্ট (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) দেওয়ার পথ প্রায় চূড়ান্ত করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই দুটি মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক আলী আকবর  বলেন, ‘মামলা দুটির তদন্ত করতে গিয়ে আমি অনেক কষ্ট করেছি। তদন্তে অভিযোগের পক্ষে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পর চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের অনুমতি চেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করি। এরপর আইও পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

আর বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা নুরুল হুদা কালবেলাকে বলেন, ‘কয়েক মাস আগে মামলা দুটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছি। এখনো তদন্ত শেষ হয়নি।’

দুদকের মামলায় একই ব্যক্তি অনুসন্ধানকারী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা হতে কোনো আইনগত বাধা আছে কি না, জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টে দুদকের মামলা পরিচালনাকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান কালবেলাকে বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। একই ব্যক্তি দুদকের অনুসন্ধানকারী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল হাইকোর্টে। এ বিষয়ে তখনকার হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) তার রায়ে বলেছেন, একই ব্যক্তি অনুসন্ধানকারী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা হতে আইনগত কোনো বাধা নেই। একই ব্যক্তি হলে আইনগত কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না; বরং তদন্ত সঠিক হবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মামলা হওয়ার পর আসামি আবেদন করতে পারবে আদালতে। দুদকের কাছে আবেদন করার কোনো সুযোগ নেই এবং আসামির করা এ ধরনের আবেদনের ভিত্তিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের কোনো প্রশ্নই আসে না।’

শুধু এ একটি মামলার ক্ষেত্রেই নয়, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) এবং অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ মো. মঈদুল ইসলাম দাবি করেছেন, এমনটি ঘটার কথা না থাকলেও দুদকে তা ঘটছে। শুধু একটি নয়, এ ধরনের আরও ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো মামলার তদন্তকালে আইও পরিবর্তনের ঘটনা ঘটার কথা না; তার পরও দুদকে ঘটছে। তদন্ত কর্মকর্তা সঠিক পথে হাঁটছেন বলেই আসামি রুষ্ট হয়ে তাকে পরিবর্তনের আবেদন করে থাকেন। এ ধরনের আবেদন করার এবং তা বিবেচনার সুযোগ দুদক আইনে নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ বাদী হয়ে করা কোনো ফৌজদারি মামলায় বাদীর আবেদনের ভিত্তিতে আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে থাকেন। কিন্তু সেখানেও আসামির কোনো সুযোগ থাকে না আইও পরিবর্তনের। একমাত্র দুদকেই ঘটে ব্যতিক্রমী এমন ঘটনা, যা আইনসম্মত নয়।’

দুদকের মামলা বিশেষ ধরনের হয়ে থাকে উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এ মহাপরিচালক বলেন, ‘একটি অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শেষ করে প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পর দুদক মামলা করে। যে প্রক্রিয়ায় দুদক অনুসন্ধান করে, তা প্রায় তদন্তের কাছাকাছি। একটি অনুসন্ধান শেষ করতে দুই-তিন বছরও লেগে যায়। তদন্তে যা যা করা হয়, অনুসন্ধানেও তা তা করা হয়। তথ্যপ্রমাণ, জবানবন্দি সবই নেওয়া হয় অনুসন্ধানে। তদন্তে শুধু একটু গুছিয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়। বর্তমান বিধি অনুযায়ী দুদক মামলা করার পরপরই চার্জশিট দাখিল করতে পারে। তদন্ত বা অনুসন্ধানের মাঝপথে আইও বা অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের সুযোগ আইনে রাখা হয়নি। তার পরও আসামিরা তাদের চাহিদামতো একটা তদন্ত প্রতিবেদন করানোর জন্যই নিজের পছন্দমতো আইও নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করে। এ কারণে আইও পরিবর্তনের আবেদন করে। এমন আবেদন বিবেচনা করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই দুদকের। কিন্তু দুদক কোন স্বার্থে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা অজানা। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দুদক কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না। তাদের মধ্যে ভীতি কাজ করবে। নিরপেক্ষ তদন্তে নিরুৎসাহিত হবেন। আসামিপক্ষ রুষ্ট হলেই দুদকে আবেদন দাখিল করবে আইও পরিবর্তনের। এতে আসামিদের রাজত্ব চলবে দুদকে।’

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বারবার ফোন করেও দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে উত্তর চাওয়া হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

দুই মামলা :

পিরোজপুরের পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক ও তার স্ত্রী নিলা রহমানসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ১৮ মার্চ দুটি মামলা করে দুদক। বরিশালের দুদক সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক আলী আকবর মামলা দুটি করেন। ৩৬ কোটি ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৯৩২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে মামলাগুলো করা হয়।

উপপরিচালক আলী আকবর তখন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ নেতা মেয়র মালেক ও তার স্ত্রী নিলার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৩৬ কোটি ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৯৩২ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একটি মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে, নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে মেয়র মালেক ও কাউন্সিলর আব্দুস সালাম বাতেনসহ পৌরসভার ২৭ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়েছে।

ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে করা মামলায় অন্য অভিযুক্তরা হলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক (সাবেক) তরফদার সোহেল রহমান, পৌর কাউন্সিলর জেলা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালাম বাতেন, পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হানিফ, পৌরসভার সচিব (অন্যত্র বদলি) মাসুদ আলম, ক্যাশিয়ার মাইনুল ইসলাম (প্রমোশন পেয়ে বর্তমানে হিসাবরক্ষক), সহকারী কর আদায়কারী মাহাবুবুর রহমান (প্রমোশন পেয়ে বর্তমানে স্টোর কিপার), নিম্নমান সহকারী শারাফাতুন মান্নান, সহকারী কর নির্ধারক ওয়াদুদ খান, সহকারী কর নির্ধারক মিজানুর রহমান, টিকাদানকারী ফরহাদ হোসেন মল্লিক, জামিউল হক, লাইজু আক্তার, রেক্সোনা মজুমদার ও জান্নাতুল ফেরদৌসী, সহকারী কর আদায়কারী মেহেদি হাসান চপল, মিজানুর রহমান মিন্টু ও রাশিদা বেগম, বাজারের রাজস্ব আদায়কারী রাজু আহমেদ, বাতি পরিদর্শক রবিউল আলম, অফিস সহকারী মাকসুদা খানম, ফটোকপি অপারেটর আনোয়ার হোসেন, নৈশপ্রহরী ফজলুল হক ও নজরুল ইসলাম, পিওন খাদিজা বেগম, দীপক কুমার পাল ও প্রহরী রণজিত।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top