ভোট ছাড়া জয়ে রেকর্ড

খাইরুল বাশার | প্রকাশিত: ১৩ নভেম্বর ২০২১ ০৯:১২

ভোট ছাড়া জয়ে রেকর্ড

স্থানীয় সরকারের চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। সবমিলিয়ে তিন ধাপে ২ হাজার ২০৩টি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ২৫৩ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। আর সাধারণ সদস্য পদে (মেম্বার) তিন ধাপে নির্বাচিত হয়েছেন ৬০৩ জন। এ ছাড়াও সংরক্ষিত সদস্য (নারী) পদে নির্বাচিত হয়েছেন ২১৪ জন। সবমিলিয়ে তিন ধাপে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন ১০৭০ জন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) করা বিভিন্ন ধাপের মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কৃত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে প্রথম ধাপে ২০৪ ইউপির নির্বাচনে ২৮ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ ছাড়া প্রথম ধাপের স্থগিত হওয়া ১৬০ ইউপিতে বিনা ভোটে নির্বাচিতের সংখ্যা ৪৪ জন। দ্বিতীয় ধাপে চেয়ারম্যান পদে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয় ৮১ জন। আর আগামী ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য তৃতীয় ধাপের ভোটে ১ হাজার ৪ ইউপিতে ১০০ চেয়ারম্যানই বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি এ নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিচ্ছে না। দলীয় প্রতীকের এ নির্বাচনে রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৩৪ জনের প্রাণ গেছে। এ নির্বাচন ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় ‘উদ্বিগ্ন’ ও ‘বিব্রত’ ইসি প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও তেমন কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

২২০৩ ইউপিতে ২৫৩ চেয়ারম্যান বিনা ভোটে নির্বাচিত হলে প্রায় ১১.৪৮ শতাংশ চেয়ারম্যান বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছে, যা বিগত ইউপি নির্বাচনের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। আর বিনা ভোটে নির্বাচিতদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী।

বিনা ভোটে নির্বাচন হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে নির্বাচন বলতে নারাজ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভদ্র ভাষায় এটাকে সিলেকশন বলা চলে। নির্বাচন মানেই হলো বিকল্প থেকে বেছে নেওয়া। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না, ওটাকে নির্বাচন বলে না।’

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম অবশ্য এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় দেখছেন না। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন বড় একটি দল (জোট) দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তৃণমূলের এ নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলে সীমাবদ্ধ।’

আগামী ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিতব্য ১ হাজার ৪টি ইউপি নির্বাচনে ১০০ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী থাকায় তারা বিনা ভোটেই নির্বাচিত হয়েছেন। যা এই ধাপের মোট চেয়ারম্যান পদের প্রায় ১০ শতাংশ। এ ছাড়া সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে আরও ৪৬৯ জন ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৩৭ জন সাধারণ সদস্য এবং ১৩২ জন সংরক্ষিত সদস্য। এ ধাপে ৬৭১ জন চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ ৩ হাজার ১৭৭ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। গত বৃহস্পতিবার তৃতীয় ধাপের ভোটের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন থাকায় ইসির সমন্বয়কৃত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকা এবং আগের প্রস্তুত করা তালিকা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া যায়। ইসির জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক আসাদুজ্জামান আরজু এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে উৎসব আমেজের ইউপি নির্বাচন বর্তমানে যেন রক্ত ঝরানোর সংঘাতের খেলায় রূপ নিয়েছে। অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ তৃণমূলের এ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখন অনেক পদেই একক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা নির্বাচন বলে না, ভদ্র ভাষায় বলতে গেলে সিলেকশন। নির্বাচন মানেই হলো বিকল্প থেকে বেছে নেওয়া। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না, ওটাকে নির্বাচন বলে না।’

নির্বাচনী সহিংসতাকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘সহিংসতা হলো লক্ষণ মাত্র। রোগ হলো সুবিধাভোগের রাজনীতি। ক্ষমতাসীন দলের পদ-পদবি পেলেই অন্যায় কিছু সুযোগ-সুবিধা পায়। পাশাপাশি অন্যায় করলে সেগুলো থেকে পার পাওয়া যায়। তাই সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রার্থীরা মরিয়া। যার ফলে যে-কোনো মূল্যে একে অপরকে মাঠ ছাড়ানোর চেষ্টা করে সহিংস পদ্ধতিতে।’ এছাড়া দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ফলে সহিংসতা বাড়ছে বলেও মনে করেন তিনি।

নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচনা করে বদিউল আলম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নির্বাসনে চলে গিয়েছে। নির্বাচন কমিশন কারো বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা নেয় না। তারা বিব্রত। উদ্ভট উদ্ভট কথা বলে। তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছে, সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে, তবু কাজ করছে না।’

তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা বাড়া প্রসেঙ্গে ইসি রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। বিএনপির নেতৃত্বে বিরাট অংশ নির্বাচন করছে না, যদিও তারা স্বতন্ত্র নির্বাচন করছে। কিন্তু তারা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করছে না। যেহেতু নির্বাচনটা আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমমনা দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করতেছে তাদের দল থেকে একাধিক প্রার্থী যাতে না হয়। স্বতন্ত্র পদে দাঁড়াচ্ছে তারা (আওয়ামী লীগ)। একটা ভয়ের মধ্যে আছে, বর্তমান পদ-পদবি হারাতে হতে পারে। এজন্য তারা দাঁড়াতে চাইলেও পরে প্রত্যাহার করে নেয়। যেহেতু এ অবস্থা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো এ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য যদি এগিয়ে না আসে, অন্য কেউ যদি নির্বাচন করতে চায় স্বতন্ত্র হিসেবে তাহলে করুক, এ রকম যদি হয়, এ রকম সিদ্ধান্ত না হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে।’

এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-২৫টি দল অংশগ্রহণ করছে না। ইভেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যারা আছে তারা দুই-একটা জায়গায় যেখানে জয়ের সম্ভাবনা আছে সেখানে ছাড়া অন্য জায়গায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। এছাড়া আওয়ামী লীগে থেকে যারা স্বতন্ত্র আছে, তারা পদ-পদবি হারাবে বলে অংশ নিচ্ছে না।’

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের ফলে জনগণ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি নাএমন প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন, ‘ভোটাধিকার বঞ্চিত হওয়ার কথা বললে যারা মনে করছে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের এগিয়ে আসা উচিত। ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে এই প্রার্থী যোগ্য না হলে তাহলে অন্য লোককে দাঁড় করাতে হবে, তাহলে যে বঞ্চিত হচ্ছে সে নিজেই দাঁড়াবে।’

দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৫ ইউপি ভোট : গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৫ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৮১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। তৃণমূলের এ ভোটে সংরক্ষিত সদস্য পদে ৭৬ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ২০৩ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ এসব পদে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ইসির দেওয়া তথ্যমতে ৩ হাজার ৩১০ জন প্রার্থীর প্রায় সবাই ১৭টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অধীনে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এছাড়া সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ৯ হাজার ৬১ জন ও সদস্য পদে ২৮ হাজার ৭৪৭ জন প্রার্থিতা করেছেন।

১ম ধাপের ২০৪ ও ১৬০ ইউপি ভোট : করোনা মহামারীর মধ্যেই দেশের ১৩ জেলার ৪১ উপজেলার ২০৪টি ইউপির ভোট হয় গত ২১ জুন। প্রথম ধাপে ৩৭১ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল গত ১১ এপ্রিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় ১ এপ্রিল তা স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে প্রথম ধাপে গত ২১ জুন ২০৪টি ইউনিয়নে নির্বাচন হয়। সেখানে ২৮ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। আর বাকি ১৬০ ইউপির মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ৪৪ জন। এই ধাপে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন ১০৫২ জন।

প্রসঙ্গত আগামী ২৩ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপে ৮৪০ ইউপিতে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top